ঢাকা রোববার, ১৩ জুন ২০২১, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮

সুন্দরবনে মধু সংকট

সেন্ট্রাল ডেস্ক
০৬ মে ২০২১ ২০:৩৭
আপডেট: ১২ জুন ২০২১ ১৬:২৬
সুন্দরবনে মধু সংকট সংগৃহিত

সুন্দরবনের খাঁটি মধুর চাহিদা প্রচুর। মৌসুম এলেই সুন্দরবনে ছুটে যান মৌয়ালরা। বনের গাছে মৌমাছির বাঁধা চাক থেকে মধু সংগ্রহ করেন মৌয়ালরা। মৌয়ালদের সংগ্রহ করা সুন্দরবনের মধু চলে যায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। বর্তমানে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের মৌসুম চলছে। তবে বৃষ্টি না থাকায় এ বছর সুন্দরবন থেকে মধু আহরণের পরিমাণ কমেছে।

মৌসুম শুরুর ২৫ দিনে সুন্দরবন থেকে মধু সংগ্রহ হয়েছে ১৩৯৪ কুইন্টাল। মৌয়াল ও বন বিভাগের মতে, বৃষ্টি না হওয়ায় এ বছর সুন্দরবনে মধুর সংকট দেখা দিয়েছে। 

১ এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের মৌসুম। মৌয়ালদের মধু আহরণ চলবে জুন মাস পর্যন্ত। সুন্দরবন থেকে খলিশা, বাইন, গরান ও কেওড়া ফুলের মধু সংগ্রহ করেন মৌয়ালরা। খুলনা বিভাগীয় বন কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী, কদমতলা, কৈখালী ও কোবাদক- এই চারটি ফরেস্ট স্টেশন থেকে ৩৯৬টি বিএলসি (বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) নিয়ে মধু সংগ্রহের জন্য সুন্দরবন গেছেন ১৫০০ মৌয়াল। ১ এপ্রিল থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত সুন্দরবন থেকে মধু সংগ্রহ হয়েছে ১৩৯৪ কুইন্টাল। মোম সংগ্রহ হয়েছে ৪১৮.২০ কুইন্টাল। রাজস্ব আদায় হয়েছে ১৪ লাখ ৬৩ হাজার ৭০০ টাকা।

২০১৯-২০ আর্থিক বছরে সুন্দরবন থেকে মধু সংগ্রহ হয়েছিল ২০০৬.৫ কুইন্টাল। মোম সংগ্রহ হয়েছিল ৬০১.৯৫ কুইন্টাল। মধু ও মোমে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ২১ লাখ ৬ হাজার ৮২৫ টাকা। মধু সংগ্রহ করতে ৫৭৩টি বিএলসি নিয়ে সুন্দরবন গিয়েছিলেন ৪ হাজার ১৩ জন।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার ৪৩ হাজার মানুষের অধিকাংশই উপকূলীয় নদী ও সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। প্রতি বছর সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে যান গাবুরা ইউনিয়নের চাঁদনীমুখা গ্রামের বনজীবী শহিদুল ইসলাম।

তিনি বলেন, সুন্দরবনে যাওয়ার জন্য ফরেস্ট অফিস থেকে অনুমতিপত্র নিতে হয়। ১৫ দিনের জন্য অনুমতিপত্র দেয় বন বিভাগ। এ বছর সুন্দরবনে মধুর সংকট। বৃষ্টি না হওয়ার কারণে মৌমাছির চাকে মধু কম।

শহিদুল ইসলাম আরও বলেন, ১০ জনের মৌয়াল দলের সঙ্গে একটি বোটে আমি সুন্দরবনে গিয়েছিলাম। ৩৫ কেজি গারন ফুলের মধু পেয়েছি। ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছি ২৫ হাজার টাকা। মাত্র আড়াই হাজার টাকা আমি ভাগে পেয়েছি। অথচ খরচ হয়েছিল প্রত্যেকের ১৫ হাজার টাকা করে। সুন্দরবনে যাওয়ার জন্য নৌকা প্রস্তুত করতে দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। এ বছর বনে মধুর সংকট চলছে।

গাবুরা ইউনিয়নের সোরা গ্রামের মৌয়াল মাহবুব গাজী বলেন, সুন্দরবনের প্রাণীর সঙ্গে যুদ্ধ করে মধু সংগ্রহ করতে হয় আমাদের। জীবনের নিরাপত্তা নেই। ঝুঁকি আর টাকা খরচ করে সুন্দরবনে যাই। কিন্তু যা মধু পাই তা দিয়ে পোষে না। এ বছর খরচের টাকাও উঠছে না। বৃষ্টি না থাকায় ফুলে মধু নেই। মৌমাছি মধু সংগ্রহ করতে পারছে না। খালি চাকগুলো পড়ে আছে। এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত মধু সংগ্রহের মৌসুম হলেও মূলত এপ্রিল মাসেই বেশি মধু সংগ্রহ হয়ে থাকে। এ বছর কিছু চাকে মধু থাকলেও সেটি খুব অল্প। ফলে কোনো মৌয়ালের এ বছর খরচ উঠছে না।
বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের নীলডুমুর খেয়াঘাট এলাকার বড় মধু ব্যবসায়ী তোহিদুল ইসলাম। মধুর অনেক খুচরা বিক্রেতা ও রাজধানীর একটি ফাস্টফুড কোম্পানিকে মধু দেন এই ব্যবসায়ী।

তৌহিদুল ইসলাম বলেন, এ বছর সুন্দরবনে ১০টি নৌকায় শতাধিক মৌয়ালকে মধু সংগ্রহ করতে বনে পাঠিয়েছি। খরচ হয়েছে ৩৩ লাখ টাকা। এ বছর বনে মধু নেই, সংকট। গত বছর ১৫০ মণ মধু সংগ্রহ হয়েছিল। এ বছর মাত্র ৫০ মণ মধু পেয়েছি। প্রতি কেজি বিক্রি করেছি ৮০০ টাকায়। ৩৩ লাখ টাকা থেকে ১০ লাখ টাকাও পাইনি। যদি বৃষ্টি হয় তবে গাছে ফুলে মধু আসবে; মৌমাছি মধু সংগ্রহ করতে পারবে। যদি বৃষ্টি না হয়; তবে এ বছর আমার অনেক টাকা লোকসান হবে।

সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা সুলতান আহমেদ বলেন, যেসব মৌয়াল সুন্দরবন থেকে ফিরছেন সবাই জানিয়েছেন, এ বছর বনে মধু নেই। বৃষ্টি না থাকার কারণে মূলত এ সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের কার্যালয় থেকে মধু সংগ্রহের জন্য চলতি এপ্রিল মাসে প্রথম ধাপে বিএলসি দেওয়া হয়েছে ১৪৮টি। এই বিএলসিতে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের জন্য সুন্দরবনে গিয়েছেন ১০৭৬ জন মৌয়াল। মধু সংগ্রহ হয়েছে ৫৩৮ কুইন্টাল। যার মূল্য ৪ লাখ তিন হাজার ৫০০ টাকা। মোম সংগ্রহ হয়েছে ১৬১.৪০ কুইন্টাল। যার মূল্য এক লাখ ৬১ হাজার ৪০০ টাকা।

খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহসিন হোসেন বলেন, চলতি মৌসুমে সুন্দরবনে মধুর পরিমাণ কমেছে। বৃষ্টি না থাকায় খাবার পাচ্ছে না মৌমাছিরা। বনের ভেতরে দেখেছি, মৌমাছিরা খাবার না পেয়ে পানি খাচ্ছে। বৃষ্টি হলে ফুলের মধু নিয়ে আসত মৌমাছিরা। সেই মধু খেত এবং চাকে জমা করত। এ বছর ফুলও কম। ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত সুন্দরবন থেকে মধু সংগ্রহ হয়েছে ১৩ ৯৪ কুইন্টাল। এখনো মে ও জুন দুই মাস মধু সংগ্রহ চলবে। সব মিলিয়ে এ বছর কতটুকু মধু সংগ্রহ হবে, সেটি মৌসুম শেষে জানা যাবে।

সূত্র: ঢাকা পোস্ট।