ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২১ অক্টোবর ২০২১, ৫ কার্তিক ১৪২৮

স্পট মার্কেট থেকে তিন কার্গো এলএনজি কিনছে সরকার

সেন্ট্রাল ডেস্ক
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৮:২১
আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০২১ ০১:২৬
স্পট মার্কেট থেকে তিন কার্গো এলএনজি কিনছে সরকার দ্রুত দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে চলতি মাসেই এলএনজি আমদানি করতে চায় জ্বালানি বিভাগ -ছবি: রয়টার্স

গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে স্পট মার্কেট থেকে তিন কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনা হচ্ছে। বিশ্ববাজারে এলএনজির দামে ঊর্ধ্বগতি সত্ত্বেও বিদ্যমান গ্যাস সংকট সামাল দিতে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। এলএনজি কিনতে এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন মিলেছে। দ্রুত দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে চলতি মাসেই এলএনজি আমদানি করতে চায় জ্বালানি বিভাগ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, স্পট মার্কেট থেকে এ পর্যন্ত মোট ১৩ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হয়। গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত এই এলএনজি আমদানি করা হয়।
জ্বালানি বিভাগের তথ্য বলছে, গত বছর প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম পড়েছিল ৩ দশমিক ৮৩ ডলার। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ৬৭ লাখ ২০ হাজার এমএমবিটিইউ এলএনজি কেনার আরো একটি প্রস্তাব ক্রয়সংক্রান্ত কমিটিতে তোলে জ্বালানি বিভাগ। প্রস্তাবে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম সিঙ্গাপুরের কোম্পানি ভিটল এশিয়া থেকে এই এলএনজি কেনার প্রস্তাব তোলা হয়। ক্রয়সংক্রান্ত কমিটির ওই প্রস্তাবে এলএনজির কার্গোতে ইউনিটপ্রতি দাম অনুমোদন করা হয় ৯ দশমিক ৩১ ডলার এবং সপ্তম এলএলএনজি কার্গোর দাম পড়ে ৯ দশমিক ৩৬ ডলার।
এলএনজির দামে ঊর্ধ্বগতি থাকায় আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত স্পট মার্কেট থেকে পণ্যটি না কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কিন্তু গ্যাসের ঘাটতি বিবেচনায় জ্বালানি বিভাগ সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
জ্বালানি বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আনিছুর রহমান বলেন, বিদ্যমান গ্যাস সংকট কাটাতে স্পট মার্কেট থেকে আরো তিনটি এলএনজিবাহী কার্গো কেনা হচ্ছে। এলএনজি কিনতে এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে অনুমতি পাওয়া গেছে। আমদানিকারকদের কাছ থেকে কোটেশন চাওয়া হয়েছে। দ্রুত দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে এ মাসের মধ্যেই একটি কার্গো আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল প্ল্যাটের তথ্যমতে, স্পট মার্কেটে বর্তমানে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ২০-২১ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে। আগামী অক্টোবরে এশিয়ার স্পট মাকেটে যে এলএনজি সরবরাহ করা হবে তার দাম পড়বে ২০ দশমিক ১০ ডলার। নভেম্বরে দাম আরো বাড়বে। ওই সময়ে এলএনজির দাম পড়বে ২১ ডলার। বিশ্ববাজারের জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এলএনজির দামও এমন ওঠানামা করছে। ডিসেম্বরেও বিশ্ববাজারে এলএনজি ঊর্ধ্বমুখী থাকবে। বিশেষত ২০২২ সালে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ২২ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।
জ্বালানি বিভাগ বলছে, দেশে গ্যাস সংকট সামাল দিতে উচ্চমূল্য থাকা সত্ত্বেও এলএনজি কেনা হচ্ছে। স্পট মার্কেটে বর্তমানে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি ১৯-২০ ডলারে ওঠানামা করছে। কোটেশন অনুযায়ী, এ দামের মধ্যেই তিন কার্গো এলএনজি কেনা হবে। প্রতি কার্গোতে আসবে ৩ কোটি ৩০ লাখ এমএমবিটিইউ এলএনজি। প্রথমটি এ মাসেই আনার পরিকল্পনা। বাকি দুটি আগামী মাসে। আমদানীকৃত এই এলএনজি দিয়ে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সরবরাহ পরিকল্পনা জ্বালানি বিভাগের।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট পাঁচটি এলএনজি কার্গো কেনার পরিকল্পনা ছিল জ্বালানি বিভাগের। উচ্চমূল্য থাকায় জুলাইয়ে এক অনুশাসনের মাধ্যমে তা স্থগিত করা হয়। তিনটি কার্গো কেনা গেলে গ্রিডে দৈনিক আরো ১০ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ বাড়বে। ফলে মোট দৈনিক ৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ থাকবে।
পেট্রোবাংলার একটি সূত্র বলছে, গ্যাসের সংকট চলবে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত। মূলত স্পট থেকে এলএনজি কিনতে না পারায় এ সংকট তৈরি হয়েছে। তবে শীতে দেশে বিদ্যুতের প্রয়োজন কমে যায়, গ্যাসের চাহিদাও সেই সময় কম থাকে। বিশ্ববাজারেও সেই সময় এলএনজি দাম পড়তে থাকে, ফলে জানুয়ারিতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির।
জানা গেছে, স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে না পারায় চলতি বছরের জানুয়ারির মাঝামাঝি জাতীয় গ্যাস গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে নেমে আসে। দৈনিক ৮০ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহের বিপরীতে সেই সময় সরবরাহ কমে দাঁড়ায় ৩৯ কোটি ঘনফুট। এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় সেই সময় দেশে অন্তত ২ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হয়। শিল্প-কারখানায় গ্যাসের চাপ কমে যায়। ১৫ পিএসআই (প্রতি বর্গইঞ্চি) চাপে কারখানাগুলোর গ্যাস পাওয়ার কথা থাকলেও তা নেমে যায় ৩-৪ পিএসআই মাত্রায়। রেশনিং করে গ্যাস সরবরাহ করা হলেও হিমশিম খেতে থাকে বিতরণ কোম্পানিগুলো।
যদিও এলএনজির উচ্চমূল্য অব্যাহত থাকার মধ্য দিয়ে চলতি বছরের জুলাইয়ে জাতীয় গ্রিডে পুনরায় এলএনজি সরবরাহ বাড়ায় পেট্রোবাংলা। উচ্চমূল্যের একটি এলএনজিবাহী কার্গো কিনে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করা হয়। সেই সময় গ্রিডে এলএনজির সরবরাহ করা হয় প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুট। এরপর অব্যাহতভাবে আগস্ট পর্যন্ত ঠিক থাকলেও চলতি মাসের শুরুতে তা আবার নেমে যায় ৬০ কোটি ঘনফুটে। কভিড মহামারী স্বাভাবিকের প্রেক্ষাপটে শিল্পকারখানা-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ায় গ্যাসের চাহিদা বাড়তে থাকে। বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্যাসের চাহিদাও বেড়ে যায়।
আগস্টের তুলনায় ১০ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় প্রভাব পড়তে শুরু করে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্প-কলকারখানায়। এরই মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতিদিন ৪ ঘণ্টা সিএনজি স্টেশন বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
উল্লেখ্য, প্রতি বছর গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ উৎপাদনেই সর্বোচ্চ গ্যাস সরবরাহ করে সরকার। কিন্তু এবার তা করা যায়নি। বরং গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় সরবরাহ কমাতে হয়েছে। এখন দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ২২৫ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। এর বিপরীতে পেট্রোবাংলা ১৩০ থেকে ১৪০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করতে পারছে।