ঢাকা শনিবার, ১৩ আগস্ট ২০২২, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯

দেবহাটায় ৫৯ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান উন্নয়নে বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থ নয় ছয়

কান্ট্রি ডেস্ক
২৬ জুলাই ২০২২ ২২:৫১
আপডেট: ১২ আগস্ট ২০২২ ০৬:৩৬
দেবহাটায় ৫৯ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান উন্নয়নে বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থ নয় ছয়

কবির হোসেন, দেবহাটা: সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলায় ৫৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় গত তিন অর্থবছরে প্রায় ১ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া যায়। এসকল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেশির ভাগ বিদ্যালয়ে নামমাত্র কাজ করে আবার কোথাও কাজ না করে কিংবা পূর্বের অর্থবছর গুলোর কাজের তালিকা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রতিবছর দেখিয়ে প্রকল্পের টাকা তুলে আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি কাজ না করেই অবৈধভাবে সাতক্ষীরার কাজী স্টোরসহ বেশ কয়েকটি চুক্তিভিত্তিক স্টেশনারি শপ’র ভূয়া ভাউচার জমা দিয়ে অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তারা যোগসাজোশে বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাত করেছেন। গত এক সপ্তাহে প্রায় ৩০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া আরও অন্তত ২৯টি বিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে একই রকম অভিযোগ পাওয়া গেছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহজাহান বলেন, উপজেলার ৫৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার গুনগত মান উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চলতি অর্থবছরে মোট ৩৪ লাখ ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়া যায়। প্রত্যেকটি বিদ্যালয় ভিত্তিক প্রকল্প কমিটির সদস্যরা ভাউচার (খরচের বিবরণ) জমা দিয়ে বিল উত্তোলন করে নিয়েছেন। বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাজ না করে ভূয়া ভাউচার জমা দিয়ে অর্থ উত্তোলন করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কেউ কাজ না করে ভুয়া ভাউচার জমা দিয়ে টাকা আত্মসাৎ করলে অভিযোগ পাওয়ামাত্র কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে’। উল্লেখ্য যে, বিগত দুটি অর্থবছরেও করোনা পরিস্থিতির মধ্যে সরকারি তদারকি না থাকায় স্কুল লার্নিং ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (স্লিপ) নামের এ প্রকল্পের বরাদ্দকৃত টাকা ভূয়া ভাউচার দেখিয়ে হরিলুট করেন অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তারা। সেসময় স্কুল বন্ধ থাকলেও সময়মতো এ প্রকল্পের টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে। উপজেলা শিক্ষা কার্যালয় সূত্র জানায়, গেল ৩১ জুনের আগেই উপজেলা শিক্ষা কার্যালয় থেকে ৫৯ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে যেসকল বিদ্যালয়ে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে এমন ২৩টি বিদ্যালয়ের নিজস্ব হিসাব নম্বরে ৭০ হাজার করে টাকা পাঠানো হয়। আর যেসব স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দু’শর কম তেমন ৩৬টি বিদ্যালয়ের নিজস্ব হিসাব নম্বরে ৫০ হাজার করে টাকা পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া ওই টাকা দিয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষা উপকরণ কেনাসহ শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে খরচ করার নির্দেশনা ছিল। এছাড়া পিইডিপি-৪ প্রকল্পের আওতায় রুটিন মেরামতের জন্য ৫৯ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৃথক ৪০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেয়া হয়। যা দিয়েও টুকিটাকি শিক্ষা উপকরণ ক্রয় ও বিদ্যালয়ে উন্নয়ন করার নির্দেশনা ছিল। পাশাপাশি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের উন্নয়নে উপজেলার ৫৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১০ হাজার টাকা করে পৃথক আরেকটি বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল।
বরাদ্দকৃত এসকল একাধিক প্রকল্পের টাকা কাজ না করে বা নামমাত্র একই কাজ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বারবার আলাদা আলাদা কর্মপরিকল্পনায় দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা শিক্ষা অফিস ও সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যোগসাজোশে আত্মসাত করে আসছেন বলে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। জানা গেছে, বিধি অনুযায়ী প্রতিটি বিদ্যালয়ে এই টাকার কাজ করার জন্য প্রধান শিক্ষক ও বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির সমন্বয়ে ১১ সদস্যের প্রকল্প গ্রহণ কমিটি এবং মালামাল ক্রয়সহ কাজ বাস্তবায়নের জন্য চার সদস্যের অপর একটি কমিটি করার কথা ছিল। বিদ্যালয় গুলোতে কাগজে-কলমে গত ৩০ জুনের মধ্যে এ প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত দেখানো হয়। বাস্তবে কমিটির সদস্যরা কোনো বিদ্যালয়ে নামমাত্র কাজ করে আবার কোনো বিদ্যালয়ে মোটেই কাজ না করে সরকারি টাকা তুলে আত্মসাৎ করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলার ৭/৮টি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা বলেন, এ প্রকল্পের কাজ বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. শাহজাজান ও দুই সহকারী শিক্ষা অফিসার আজহারুল ইসলাম এবং মুনির আহমেদের। কিন্তু শিক্ষা অফিসই দূর্নীতিগ্রস্ত। কাজ হোক আর না হোক শিক্ষা অফিসকে ঘুষ দিতে হয়। না দিলে তাঁরা হয়রানি করেন। শিক্ষা অফিসকে খুশি রেখে কাজ শুরু করার আগেই আমরা কাজ শেষ হয়ে গেছে মর্মে ভাউচার জমা দিয়ে টাকা উত্তোলন করে নিই’। এসব প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দকৃত অর্থ কিভাবে ব্যায় করা হয়েছে তা জানতে সরেজমিনে বড়শান্তা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পুটিমারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সুবর্ণাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আন্দুলপোতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চরবালিথা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গোবরাখালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, টাউন শ্রীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঘলঘলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সখিপুর দিঘিরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রতেœশ্বরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নারিকেলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, এনামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর নাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আষ্কারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেজোরআটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জগন্নাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গড়িয়াডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নুনেখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফুলবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হিজলডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কোমরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভাতশালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মৃধাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিন নাজিরের ঘের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আতাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সুশীলগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জোয়ার গুচ্ছগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শশাডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাঙ্গাশিশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হিরারচক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বালিয়াডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, টিকেট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গেলে এসকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা সরকারি বরাদ্দকৃত অর্থ কিভাবে খরচ করেছেন বা কি কি মালামাল ক্রয় করেছেন তার সুষ্পষ্ট কোন ব্যাখা দিতে পারেননি। এব্যাপারে দেবহাটা উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবিএম খালিদ হোসেন সিদ্দিকী বলেন, সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমানিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সর্বশেষ সবখবর